English Arabic French German Hindi Italian Portuguese Russian Spanish

Related Article

মোবাইল ফোন টাওয়ারে পরিবেশ বিপর্যয়

Print
AddThis Social Bookmark Button

মো. হুমায়ুন কবীর

মোবাইল ফোন তারবিহীন সহজে বহনযোগ্য টেলিফোন বিশেষ। এ ফোন সহজে যেকোনো স্থানে বহন ও ব্যবহারের কারণে এর নামকরণ হয়েছে মোবাইল ফোন। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য টাওয়ার স্থাপন করতে হয়। একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর অন্তর টাওয়ার স্থাপন করে নেটওয়ার্ক কাভারেজ সম্পূর্ণ করা হয়। যার নেটওয়ার্ক যতবেশি থাকবে তার মোবাইল গ্রাহক সংখ্যাও বেশি হবে। ফলে মোবাইল অপারেটরগুলো নেটওয়ার্ক সম্প্র্রসারণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন অপারেটরের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ফলে মোবাইল টাওয়ার এখন যত্রতত্র চোখে পড়ছে। মোবাইল টাওয়ার স্থাপনে কোনো প্রতিক্রিয়া আছে কি না তার গবেষণাও বর্তমানে হচ্ছে। বলা হচ্ছে মোবাইল টাওয়ারের মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। পরিবেশ থেকে আমরা বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন উপাদান গ্রহণ করি। পরিবেশের মূল্যবান উপাদানসমূহের ঘাটতির জন্য ভবিষ্যতে মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়বে। এছাড়া জীববেচিত্র্যের ক্ষতি হলেও তা পরিবেশের ক্ষতির মাধ্যমে মানুষের জীবন সংকটাপন্ন করে তুলবে।

মোবাইল টাওয়ার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কি না তার আশংকা প্রকাশ করেছেন বিশ্লে­ষকরা। মোবাইল টাওয়ার থেকে বিচ্ছুরিত তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণের মাধ্যমে এ ক্ষতি হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বর্তমানে ছয়টি মোবাইল ফোন অপারেটর কাজ করছে। মোবাইল ফোনের বর্তমান গ্রাহক সংখ্যা প্রায় নয় কোটি ৫৫ লক্ষ। এত সংখ্যক গ্রাহকদের সেবা প্রদান করার জন্য দরকার মোবাইল অপারেটরদের নিরবিচ্ছিন্ন ফোন লাইন। ফলে টাওয়ার সম্প্রসারণের প্রয়োজন হয়। বসাতে হয় বেস টাওয়ার। এক হিসেবে দেখা যায় সব মিলিয়ে বেস টাওযার এখন দেশে ৩০ হাজার।
গ্রামে টাওয়ার বসানো হচ্ছে ধানক্ষেত, পরিত্যক্ত উঁচুজমি, রাস্তার পাশে বন্যামুক্ত স্থানে আর শহরে বসানো হচ্ছে বিভিন্ন ভবনের ছাদে। এমনকি বাসা-বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ছাদেও টাওয়ার বসানো হচ্ছে।

সম্প্রতি ভারতে মোবাইল টাওয়ারের ক্ষতিকর দিক বর্ণনা করে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে । উক্ত রিপোর্টে চড়–ই, মৌমাছি, ব্যাঙ, বাদুর চামচিকা, শালিক, টুনটুনি, ময়না, টিয়া প্রভৃতি মোবাইল ফোনের টাওয়ার থেকে বিচ্ছুরিত তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণের জন্য অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে বলে বিজ্ঞানিরা দাবি করেছেন। পশু-পাখি-পতঙ্গকূলের আচরণ বিকিরণের জন্য বদলে যাচ্ছে, যা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। আচরণ বদলের সাথে সাথে প্রজননেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে তাদের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সমস্ত জীবজগতের ওপর।

রিপোর্টে তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণকে নবতর দূষণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মোবাইল ফোন টাওয়ার ও যেকোনো কমিউনিকেশন টাওয়ারই এ নবতর দূষণের জন্য দায়ী। স্বল্পমেয়াদে পরিবেশে তেমন সমস্যা না হলেও দীর্ঘমেয়াদে এদের মাধ্যমে পরিবেশে নানাধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে।

মোবাইল ফোনের তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে চড়–ই পাখির ওপর। বিজ্ঞানিরা এ পাখির ওপর গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছেন, মোবাইল টাওয়ারের সন্নিকটে এর অস্তিত্ব বিলিন হয়ে গেছে। ফলে মোবাইল টাওয়ার সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাসা, বাড়িতে এর আনাগোনা চোখে পড়ছে না। টাওয়ার থেকে দূরত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চড়–ই পাখির সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার বিকিরণের ফলে চড়–ই পাখি তার প্রজনন ক্ষমতাও আশংকাজনকভাবে হারিয়েছে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে পারছে না বিকিরণের কারণে। ইউরোপের অনেক শহরেও মোবাইল ফোন টাওয়ার বিকিরণের কারণে চড়–ই পাখির পরিমাণ কমে গেছে। সেখানে ৭৫ ভাগ চড়–ই পাখি উধাও হয়ে গেছে বলে এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। চড়–ই পাখির মতো আশংকাজনকভাবে কমে যাচ্ছে শালিক, টুনটুনি, বুলবুলি, ময়না, টিয়া, সারস পাখি, ইদুর, বাদুড়, চামচিকা ও ব্যাঙ।

মৌমাছির উপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে বিকিরণের প্রভাবে এদের মধ্যে এক ধরনের উদ্ভুদ আচরণ লক্ষ্য করা গেছে যার নাম দেয়া হয়েছে ‘করোনি কোরাস ডিসঅর্ডার (সিসিসি)’। সিসিসি সম্পর্কে গবেষকরা জানিয়েছেন, মোবাইল ফোন টাওয়ারের আশেপাশে বসবাসরত মৌচাকের কর্মী মৌমাছির দল খাবার জোগাড় করতে গিয়ে হঠাৎ করে তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণ ক্ষেত্রের মধ্যে পড়ে দিশেহারা হয়ে মৌচাকে ফেরার পথ চিনতে পারছে না এবং মাঝপথে মারা যাচ্ছে। এরকম ঘটনা গতবছর আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে ৬০ শতাংশ মৌচাকে এবং পূর্ব উপকূলে ৭০ শতাংশ মৌচাকে ঘটেছে। ভারতেও এর উদাহরণ আছে। রানি মৌমাছির ডিম পাড়ার পরিমাণও আশংকাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ফলে মৌমাছির সংখ্যাও কমছে।

আবার ছোট ছোট পতঙ্গের জীবনও হুমকির মুখে পড়ছে বিকিরণের কারণে। এদের অস্তিত্ব সংকটের কারণে প্রকৃতিতে ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হবে। যেহেতু পতঙ্গও পরাগায়নের একটি মাধ্যম সেহেতু ফুলের পরাগায়ন না হলে ফসলের উৎপাদনও কমে যাবে। ফলে কৃষি উৎপাদনে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় মোবাইল ফোন টাৗয়ারের তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণের বিষয়ে উদ্বিগ্ন-যার রিপোর্ট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বিকিরণ কমানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মোবাইল ফোন টাওয়ার স্থাপনে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবান্ধব একটি নীতিমালা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।

লেখকঃ প্রভাষক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, সরকারি এম এম কলেজ, যশোর।

Add comment


Security code
Refresh

| + - | RTL - LTR