English Arabic French German Hindi Italian Portuguese Russian Spanish

ধ্বংস হচ্ছে গারোপাহাড় : গাছ ও পাহাড় কাটা বন্ধ এবংবনায়ন জরুরি

Print
AddThis Social Bookmark Button

শাহরিয়ার মিল্টন

17th March, 2013

 

 

 

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী গারো পাহাড়ের জীবনবৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের শেরপুর জেলা অংশের ২০ হাজার ৪৯ একর বনভূমি রয়েছে। পাহাড় ও বনখেকোর লোভে পড়ে উজাড় হচ্ছে বন। হারাচ্ছে ঐতিহ্য, বিলুপ্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।


প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, মাত্র ২০ বছর আগেও গারো পাহাড় বনাঞ্চলে দিনের বেলায় সূর্যের আলো মাটিতে পড়ত না। আর এখন বন উজাড়ের ফলে ন্যাড়া পাহাড়ে পরিণত হয়েছে এই পাহাড়। অবাধে গাছ কেটে নেয়ায় কোনো কোনো এলাকা যেন ফুটবলের মাঠ।
বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার মধুটিলা, রাংটিয়া ও বালিয়াজুড়ি এই তিনটি বন বিভাগীয় রেঞ্জের আওতায় রয়েছে গারো পাহাড় বনাঞ্চল। এক সময় এই পাহাড় ও বনাঞ্চলে ছিল সেগুন, শাল, গজারি, কড়ই, গামারি, গর্জন, জারুল, মেহগনির মতো মূল্যবান গাছ। এছাড়াও ছিল আম, জাম, কাঁঠাল, বরই, আমলকী, বহেরা, হরীতকীসহ বিভিন্ন ফলজ ও ঔষধি গাছ। এই গারো পাহাড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কবিরাজ বা হেকিমরা ছুটে যেতেন ঔষধি গাছের জন্য। পাহাড় এলাকাতেও ছিল অসংখ্য কবিরাজের আস্তানা। কিন্তু সেসব গাছ-গাছড়া এখন বিলুপ্ত হওয়ায় ওইসব কবিরাজও তাদের পেশা ছেড়ে দিয়েছেন এবং মানুষও আয়ুর্বেদী চিকিত্সা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।


ওইসব প্রজাতির গাছের অনেকগুলোই এখন কতিপয় গাছ ও কাঠ ব্যবসায়ী এবং বনদস্যুদের অবাধে গাছ কাটার কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সামান্য কিছু প্রজাতির গাছ থাকলেও সেগুলোও এখন বিলুপ্তির পথে। এক সময় এই গারো পাহড়ে বাঘ, ভাল্লুক, হরিণ, বানর, হনুমান, সজারু, ময়ূর, টিয়া, ময়না, খরগোশ, শূকর, বন মুরগি, বিভিন্ন প্রজাতির সাপসহ অসংখ্য পশু-পাখির অবাধ বিচরণ ছিল।


অবাধে পরিবেশ ধ্বংস করে গাছ আর পাহাড় কাটাসহ পশু-পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্যের কারণে ওইসব পশু-পাখি অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে কালেভাদ্রে বানর, বন মোরগ, শূকর, কাঠবিড়ালি আর সামান্য কিছু সাপের দেখা মেলে বলে স্থানীয় এলাকাবাসী ও বন কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে।


শেরপুরের গারো পাহাড়ে ওইসব পশু-পাখির বিচরণের কথাটি বর্তমান প্রজন্মের কাছে কল্পকাহিনী বা ইতিহাস মাত্র। সীমান্তের পাহাড়ি এলাকায় সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার হাতি পাগাড়, বারোমারি, সমশ্চূড়া, মধুটিলা, ঝিনাইগাতী উপজেলার মরিয়মনগর, হলদিগ্রাম, সন্ধ্যাকুড়া, রাংটিয়া, হালচাটি, বড় গজনি, ছোট গজনি, বাকাকুড়া, দুধনই, তাওয়াকুচা, শ্রীবরদী উপজেলার বালিজুড়ী, রাজার পাহাড়, কর্ণঝোরা, খ্রিস্টানপাড়া, খাড়ামোড়া, রাঙ্গাজান, হাড়িয়াকোনা, বাবলাকোনাসহ বিভিন্ন পাহাড়ি ও সমতল বনভূমিতে এক সময় অসংখ্য বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ, বানর ও হনুমান দেখা যেত। পাহাড়ে একজাতীয় চাম কাঁঠাল (ছোট ছোট আকারের কাঁঠাল) এবং পাহাড়ি কলা ছিল ওইসব বানর ও হনুমানের প্রধান খাদ্য। কিন্তু সেসব ফলের গাছ উজাড় হওয়ার ফলে বানর ও হনুমান খাদ্য সঙ্কটে পড়ে এর মধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। একইভাবে হরিণও বিলুপ্ত হয়েছে খাদ্য সঙ্কট এবং শিকারিদের খড়গে পড়ে। এছাড়া বাঘ-ভাল্লুকসহ অন্যান্য জীবজন্তু বিলুপ্ত বা পাহাড় ছেড়েছে গভীর জঙ্গলের আবাসস্থল লোকালয়ে পরিণত হওয়ায়।


অপরদিকে, বনের বিভিন্ন প্রজাতির পাখ-পাখালি তাদের বসবাসের উপযোগী ও পরিবেশবান্ধব গাছ-গাছালি হারিয়ে যাওয়া এবং অবাধ বৃক্ষনিধনের ফলে এখন গারো পাহাড় এলাকায় কোনো পাখ-পাখালির কলরব শোনা যায় না।


এলাকাবাসীর অভিযোগ, বন বিভাগের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বনদস্যু ও মুনাফালোভী কাঠ ব্যবসায়ীর যোগসাজশে উজাড় হয়েছে বন। এরপর ওইসব ন্যাড়া পাহাড়ে সরকার অংশীদার ভিত্তিতে সৃজনী বা উডলড বাগান তৈরি করা হচ্ছে গত প্রায় ১৫ বছর যাবত।
ওইসব বাগানে দেশীয় প্রজাতির কোনো গাছ না লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব নয় এমন ভিনদেশীয় আকাশমণি, ইউক্লিপটাস, বেলজিয়াম, মিনজিরিসহ নানা প্রজাতির গাছ রোপণের ফলে একদিকে পাহাড়ি মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে ওইসব গাছে দেশীয় কোনো পাখি আবাসস্থল করতে না পেরে এবং তাদের খাদ্যের অভাবে পাখিদের অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যাচ্ছে।


জানা গেছে, নব্বই দশকের শুরুতে গারো পাহাড় এলাকায় স্থানীয়রা প্রথমে পাহাড় কেটে পাথর উত্তোলন শুরু করলে ওই বছরই পাহাড় ধসে ও মাটিচাপা পড়ে কয়েক ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তত্কালীন সরকার পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেয়।


জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার সমশ্চূড়া, বুরুঙ্গা, কালাপানি, বাতকুঁচি, বারোমারি, দাওধরা, ডালুকোনা, কাঁটাবাড়ী, পানিহাতা, ঝিনাইগাতী উপজেলার রাংটিয়া, সন্ধ্যাকুড়া, হালচাটি, নকশি, বাঁকাকূড়া, গজনি, তাওয়াকুচা, গান্ধিগাঁও শ্রীবরদী উপজেলার কর্ণঝোড়া, বালিজুড়ি, খারামোড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ফুট গর্ত করে এবং পাহাড় কেটে অবাধে পাথর উত্তোলন করে গারো পাহাড় ধ্বংস এবং পাহাড়ের সৌর্ন্দয নষ্ট করা হয়েছে। এলাকার বেশকিছু জায়গায় কতিপয় প্রভাবশালী মহল অবৈধভাবে মূল্যবান চীনামাটি বা সাদামাটি ও কাচ বালি উত্তোলন করে দেশের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের মহোত্সবে মেতে ওঠে। পরে ওইসব পাহাড় কাটাও বন্ধ করে দেয় প্রশাসন।
জেলায় গত ২০ বছরে সরকারি হিসেবে মাটিচাপায় ৩০ শ্রমিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হলেও স্থানীয় সূত্রমতে, মৃতের সংখ্যা প্রায় ৭০ এবং পঙ্গু ও আহত হয়েছেন শতাধিক শ্রমিক। অপরদিকে ওইসব পাথর ব্যবসায়ী বেকার হওয়া পাথর শ্রমিকদের ক্ষেপিয়ে তুলে তাদের দিয়ে বন ধ্বংসে নামিয়ে দেয়। ফলে গত তিন-চার মাস ধরে শুরু হয়েছে গাছ কাটার মহোত্সব।


গারো পাহাড়ের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার বিভিন্ন শাল-গজারি বাগান ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে প্রতি রাতেই মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে ওইসব গাছ চোর সিন্ডিকেট সদস্য। বিশেষ করে জেলায় গজনি বিটে বর্তমান বিট অফিসারের ছত্রছায়ায় ব্যাপকভাবে চলছে গাছ কাটার মহোত্সব।


সূত্র জানায়, ওই সিন্ডিকেট চক্র বন বিভাগের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং পুলিশ ও বিডিআর সদস্যদের যোগসাজশে নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে গাছ কাটা। তবে লোকদেখানো ভান করে প্রশাসন মাঝেমধ্যে দুয়েকটি কাঠের চালান আটক করলেও তা আবার গোপনে ছাড়িয়ে নিয়ে যায় ওই সিন্ডিকেট চক্র। শেরপুর শহরের প্রভাবশালী মহল বিভিন্ন কনস্ট্রাকশন কাজে এবং ব্যক্তিগত বহুতল বাড়ি নির্মাণে পাইলিং করতে প্রকাশ্যে গজারি গাছ ব্যবহার করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থাকছে নীরব।


সূত্র আরও জানায়, বন বিভাগ চুরি যাওয়া গাছের চিহ্ন মুছে ফেলতে রাতারাতি চুরি যাওয়া গাছের গুঁড়ি উপড়ে ফেলে। এছাড়া বন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী বনের কোনো গাছ চুরি গেলে তা নিকটস্থ থানায় জিডি করতে হয়। কিন্তু বন বিভাগ তা করে না। তবে গাছ চুরির ব্যাপারে বন বিভাগের সঙ্গে বনিবনা না হলে এবং তাদের স্বার্থে কেউ ব্যাঘাত ঘটালে তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক গাছ চুরির মামলা ঠুকে দেয় বলে পাহাড়ি এলাকার একাধিক নিরীহ গ্রামবাসী অভিযোগ করেছেন।


ঝিনাইগাতী উপজেলার গান্ধিগাঁও গ্রামের আবদুল জলিল বলেন, বন এলাকায় যেদিন শেরপুর-ময়মনসিংহ বা ঢাকা থেকে বন বিভাগের বড় কর্তারা বন পরিদর্শনে আসে ওই রাতেই শুরু হয় গাছ কাটার মহোত্সব। এর কারণ হিসেবে তারা জানায়, বন বিভাগের কর্তাব্যক্তিরা বনে এলে তাদের আপ্যায়ন বাবত খরচ ও সালামি দিতে হয় সংশ্লিষ্ট বিট অফসারকে। ফলে এই খরচের টাকা তুলতে স্থানীয় অসাধু গাছ ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি করে ওই রাতেই বেশকিছু গাছ কেটে বিক্রি করে তাদের খরচ তুলতে হয়। ঝিনাইগাতী উপজেলার রাংটিয়া রেঞ্জের গজনি বিট অফিসার মো. শাহানশাহ আলম তার এলাকায় গাছ কাটার মহোত্সবের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। বন বিভাগের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের উত্থাপিত আভিযোগ অস্বীকার করে রাংটিয়া রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বর্তমানে পাহাড় কাটা সম্পুর্ণ বন্ধ রয়েছে। তবে লোকবল সঙ্কটের কারণে বনের গাছ কাটা রোধ শতভাগ সামাল দেয়া যাচ্ছে না। শেরপুরের বিশিষ্টজনদের মতে, গারো পাহাড় রক্ষায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া উচিত। সেই সঙ্গে অবাধে পাহাড় ও বন কাটা বন্ধ করে দেশীয় প্রজাতির ফলমূলসহ নানা বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করে এবং বনায়ন করে হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

 

 

Source: amardeshonline

 

 


 

 

Add comment


Security code
Refresh

| + - | RTL - LTR